বিধান সাহা

মেধাবীরা মিডিয়ার লেজুড়বৃত্তি করে না বিধান সাহা


 

[বিধান সাহা। বাঙলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবি।  জন্ম ২১ মার্চ ১৯৮৪ সাল, টাঙ্গাইল। পৈতৃক নিবাস বগুড়া, বাঙলাদেশ। বাবা বিভূতী ভূষণ সাহা, মা শেফালি রানী সাহা। চারুকলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর। থাকেন ঢাকায়, একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। প্রকাশিত বই তিনটি : অব্যক্ত সন্ধির দিকে (কবিতা, ২০১৫), এসো বটগাছ (না-কবিতা, ২০১৭), শ্রীদেবী অপেরা (কবিতা, ২০১৫)। কথাবলির পক্ষ থেকে কথা হলো তার সঙ্গে লেখালেখি, জীবনযাপন, ছবি আঁকা-সহ নানা বিষয়ে।]

 

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য : আপনার সদ্য প্রকাশিত বই ‘শ্রীদেবী অপেরা’ নিয়ে বলেন।

বিধান সাহা : 'শ্রীদেবী অপেরা' প্রকাশ করেছে কলকাতার ‘তবুও প্রয়াস’ প্রকাশনী। এক ফর্মার এক কবিতা পুস্তিকা। আনন্দের খবর আরো এই যে, বাংলাদেশের বারো জন কবির এই সিরিজের সবগুলো বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন বাংলাদেশেরই কবি ও শিল্পী রাজীব দত্ত। আর গ্রন্থসজ্জা করেছি আমি। বইটি উৎসর্গ করার সময় খুব বেশি ভাবতে হয়নি। যে মানুষগুলো আমার অন্তরে থাকেন, যে মানুষগুলোকে আমি শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি—প্রত্যক্ষ যোগাযোগ খুব কম বা সেভাবে না থাকলেও আমার হৃদয় তাঁদেরকেই স্মরণ করেছে। বইটি উৎসর্গ করেছি কবি গৌতম বসু, গৌতম চৌধুরী, মজনু শাহ এবং বিজয় আহমেদ-কে।

নির্ঝর : বইয়ের কবিতাগুলি কখন লেখা হয়েছে?

বিধান : এই 'শ্রীদেবী অপেরা' লেখা হয়েছিলো গত মার্চে। গলায় পলিপাসের অপারেশনের পরে ফুলরেস্টে ঘরেই থাকতে হয়েছিলো কিছুদিন। একমাস কথা বলা ছিলো বারণ। মূলত তখনই কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে লেখাগুলোর সূচনা হয়। পুরো লেখা শেষ হবার পরের কয়েক মাস ধরে চলেছে এডিট-রিরাইট। এক ফর্মার বই হবে এটা তখনও ভাবনার বাইরে ছিলো। সেলিম মণ্ডলের প্রস্তাব পাওয়ার পরেই মূলত মাথায় আসে এভাবে পাণ্ডুলিপি সাজানোর। এ লেখাগুলোরও পূর্বে এই স্টাইলের আরো কিছু লেখা ছিলো। সেগুলো আলাদা একটা সিরিজ। প্রথমে ওই লেখাগুলোর সঙ্গে এই লেখাগুলোকে মার্জ করিয়ে একটা পাণ্ডুলিপি সাজাতে চেয়েছিলাম। পরে লেখাগুলো নিজ ধর্মেই স্বতন্ত্র পথ তৈরি করে নিয়েছে।

নির্ঝর : বইয়ের নাম ‘শ্রীদেবী অপেরা’ কেন?

বিধান : 'শ্রীদেবী অপেরা' মূলত এক সাংসারিক দর্পণ। আমাদের প্রাত্যহিকতার ধারাবিবরণ। যেখানে আমার চিরবিষণ্ন হাউজি-বাগানে ফুটে উঠেছে রঙিলা বুদ্বুদ।

নির্ঝর : বইমেলা ২০২০ এ কি কোন বই আসছে আপনার?

বিধান : কয়েকটা পাণ্ডুলিপি রেডি থাকলেও ২০২০-এ এর বাইরে আর কোনো বই আসবে কিনা এখনও নিশ্চিত নই।

নির্ঝর : কবিতার জন্যে যে গত বছর ‘আদম’ আপনাকে সম্মাননা দিলো, এই বিষয়ে আপনার অনুভূতির কথা বলেন।

বিধান সাহা : খুবই আনন্দের বিষয় ছিল। আনন্দ এ কারণে আরো বেশি যে, আমি আদমের দফতরে বই জমা দেয়া, কিংবা, ‘আদম’ সম্পাদক গৌতম মণ্ডলের সঙ্গে সেভাবে আলাপ-পরিচয়ও ছিলো না আমার। তাঁরা নিজ দায়িত্বেই লেখকের বই সংগ্রহ করেন এবং তাকে সম্মানিত করেন। সাধারণত সাহিত্য পুরস্কারের যে উদাহরণগুলো দেখতে পাই সেখানে ব্যক্তি যোগাযোগ, নানারকম তাগাদা-তদ্বির ছাড়া পুরস্কার পাওয়ার নজির তো খুব বেশি দেখা যায় না।

 

নির্ঝর : শিল্প সাহিত্যের উকর্ষের ক্ষেত্রে সম্মাননা বা পুরস্কার আদৌ কোনো ভূমিকা রাখে কিনা? রাখলে কেমন তা, আপনার কী মনে হয়?

বিধান : অবশ্যই সম্মাননা একটা ভূমিকা রাখে। সেটা খুব নীরবে। হয়তো পুরস্কার প্রাপ্ত লেখকের অন্তর্জগতে একটা দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রেখে যায়। তিনি যে সঠিক পথেই হাঁটছেন, এই বিশ্বাস, যে কোনো স্বীকৃতি আরো গাঢ় করে। তবে এটাও ঠিক একজন লেখক কখনও সেই স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করেন না।

নির্ঝর : আপনার কাছে কবিতা কী?

বিধান : কবিতা যে ঠিক কী, বুঝতে পারলেও বোঝাতে পারি না। তবে এটুকু বলা যায়, কবিতা এক ধরনের আরোগ্য দেয়। মাঝে মাঝে কি যেন বলতে চাই। কী যেন বলার জন্য ভেতরটা উন্মুখ হয়ে থাকে। আমার সেই না বলা কথা, না বলা অনুভবকে শব্দ-বাক্যে প্রকাশ করি। কেউ কেউ সেটাকে কবিতা বলে। একবার লিখেছিলাম, কবিতা কী? কিছু না কবিতা। একটা চিন্তাবলয়ের ভেতর টগবগ করতে করতে ছিটকে বেরিয়ে আসা বাক্যরাশি। কবিতা কিছু না-ই আসলে। হয়তো, আমারই নিজস্ব অন্ধকার থেকে ঝলকে ওঠা কতিপয় বাক-বিভঙ্গ—আলোর তুফান—রাশি রাশি মিরাকলিক তোরণ—একটা আয়নামহলে আবদ্ধ আমারই সহস্র মুখ—অন্ধ-জাদুকরের হাসি। মনে হয়, কবিতা হলো ব্রহ্মতেজকে ধারণ করে, আরো এক বিপন্নতার দিকে তাকিয়ে, একা একা হেঁটে যাওয়া—অব্যক্ত সন্ধির দিকে।

নির্ঝর : আপনার লেখালেখির শুরু কেনো বলে মনে হয়?

বিধান : সুনির্দিষ্ট কারণ যে কী তা হলফ করে বলা ‍মুশকিল। তবে অনেক বড় কারণ হতে পারে ব্যক্তিজীবনে নিজের ব্যর্থতা। নিজের আক্ষেপের কথা, নিজের বেদনার কথাগুলো বলার জন্য কাউকে যখন পাওয়া যায় না, কিংবা, বললেও কেউ যখন আমার মতো করেই আমার বেদনাকে বুঝতে পারে না, তখন শব্দ-বাক্যই শেষতম আশ্রয় হিসেবে সামনে আসে। এগুলো একধরনের কারণ হয়ে থাকতে পারে। আরেকটা কারণ খুব বড় করে বলা যায়। সেটা হলো আমাদের পারিবারিক আবহ। আমার বড় দাদু (বাবার জ্যাঠামশায়) পদাবলি-কীর্তন করতেন। শৈশবে আমাদের উঠনে কীর্তনের আসর বসতো। কত কত পদ সেই তখনই শুনেছি। খোল করতালের একটা রিদম তখন থেকেই মনের ভেতর গেঁথে গিয়েছিলো। কথাকে যে সুরে বেঁধে মানুষের মনের ভেতর গেঁথে দেয়া যায়, সেটা অবচেতনে হয়তো ছিলো। আমার ঠাকুমা, রাতে ঘুমানোর সময় বুকের ভেতর জড়িয়ে নিয়ে কত কত কীর্তনের পদ আর ছড়া শোনাতে শোনাতে ঘুম পাড়াতেন! আমাদের দৈনন্দিন পড়ালেখা শেষ করে দলবেঁধে আমরা আমার দাদুর কাছে বসতাম গল্প শুনতে। গ্রামের সেই সন্ধ্যার আবহে দাদুর মুখের গল্প শুনতে শুনতে আমিও যেন সেই গল্পের চরিত্র হয়ে উঠতাম কখনও কখনও। এসব হয়তো অনুঘটক হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে।

নির্ঝর :  আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

বিধান : কোনো দৃশ্য বা ঘটনা, বা, যা কিছু আমাকে স্পর্শ করে বা উন্মত্ত করে তারপর কীভাবে কীভাবে যেন তা শব্দ-বাক্যের শরীর নিয়ে হাজির হয়। ব্যাখ্যাতীত ব্যাপার। তবে পরিকল্পনা করে কখনও আসে নাই। বা, ভেবেছি যে ওই বিষয়ে একটা কিছু লিখবো, পরে লিখেছি। এমন ঘটনা প্রায় হয়নি বললেই চলে।

নির্ঝর : কবিতা প্রকাশের মাধ্যম হিশেবে এই যে ব্লগ, বারোয়ারি ব্লগ, ফেসবুক, সাহিত্য-পোর্টাল তথা অনলাইনের এই ভার্চুয়াল পৃথিবীকে আপনি কীভাবে দেখেন?

বিধান : খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। স্বাধীন মাধ্যম। তবে সোসাল মিডিয়া, ফেসবুককেই মিন করছি, একটা হাটের মতো। বারো ভূতের আখড়া। ফেসবুক থেকে বড়জোর ইনফর্মেশনগুলো পাওয়া যেতে পারে। শিল্পের জন্য, পাঠের জন্য একটু আড়াল দরকার হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ওয়েব পেজ, সাহিত্যের পোর্টালগুলো সেই ভূমিকা রেখে চলেছে।

নির্ঝর : আমাদের অনেককেই বলতে শুনি, পশ্চিমবঙ্গের কবিতার চেয়ে বাঙলাদেশের কবিতা ভালো। এই সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

বিধান : এই বাঙলাদেশ থেকে, এতো দূর থেকে পশ্চিমবঙ্গের সকল কবিতা আমি পড়ে ফেলেছি, এমন দাবি করা মিথ্যাচার। তবে অন্তর্জালের মাধ্যমে যতটুকু পড়া হয়েছে, দেখেছি যে বাঙলাদেশের এই সময়ের কবিতা অনেক বৈচিত্রপূর্ণ।

নির্ঝর : আপনার সমকালীন কবিদের লেখা কবিতা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

বিধান : আমাদের সময়ে প্রচুর এক্সপেরিমেন্টাল লেখা চোখে পড়ছে। সেগুলোর মধ্যে একটা বড় অংশ শিল্পতীর্ণও হচ্ছে। আমাদের পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে, অন্তত দুইটা দশক যদি ধরা যায়, এই সময় অনেক বৈচিত্রপূর্ণ লেখা চোখে পড়ছে। আর লেখা হচ্ছে প্রচুর।

নির্ঝর : হুঁ। তবে আমার কাছে কবিতা তো কবিতাই। কবিতা কোনো এক্সপেরিমেন্টের বিষয় নয়। ফলত যারা কবিতা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন, দুয়েকজন বাদে সবাই এক্সপেরিমেন্টের মধ্যেই ফুরিয়ে গেছেন। যাইহোক এইবার বলেন, সাহিত্যের ক্ষেত্রে রাজনীতি, সিন্ডিকেট, দলবাজি ইত্যাকার বিষয়কে আপনি কীভাবে দেখেন?

বিধান : শিল্প-সাহিত্যের জন্য রাজনীতি সচেতন হওয়া খুবই দরকারী। আমি আবারও বলছি, খুবই দরকারী। আর সিন্ডিকেট বা দলবাজির যে বিষয়, ওটাও ভেঙে পড়ছে ধীরে ধীরে। এখন ওপেন মিডিয়ার যুগ। প্রত্যেকেই তার নিজের মতো স্বাধীনভাবে চলতে-বাঁচতে চাইছে। তবে এর একটা পজেটিভ সাইড আছে। ধরেন, সমমনা কিছু লেখক নিজেদের চিন্তা-ভাবনাকে প্রকাশ করার জন্য একসাথে কিছু একটা করতে চাইলো বা করলো, সেটাকে কি আমরা দলবাজি বা সিন্ডিকেশন বলবো? সুতারং দেখতে শেখাটা খুবই জরুরী। বা, কীভাবে দেখতে চাইছি। এখানেই রাজনৈতিক সচেতনতার বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যায়।

নির্ঝর : আচ্ছা। আপনার কথা হয়তো ঠিক। কিন্তু আমি মনে করি যৌথভাবে সন্তান উৎপাদন ছাড়া আর কোনো ক্রিয়েটিভ কাজ করা যায় না। সমমনা হোক অসমমনা হোক, ইদানীং একসঙ্গে বসলেই মদ খাওয়া হয়, খিস্তি হয়, মারপিঠ হয়, আরেকদলের গোষ্ঠী উদ্ধার হয়, কবিতা পাঠ বা পরিকল্পপনাও হয়। তবে ইদানীংকার কবিতাপাঠের আসরে নিজের কবিতা ছাড়া অন্যের কবিতা কেউ শোনে না বলেই আমার অভিজ্ঞতা বলে। বাদ দেন। এইবার বলেন, লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পা কী?

বিধান : খুব বেশি দূর ভাবি নাই আসলে। লিখে যেতে চাই। শেষ দিন পর্যন্ত। এটুকুই।

নির্ঝর : কবিতাই লিখবেন, নাকি ফিকশনেও যাবেন?

বিধান : না না, শুধু কবিতা কেন লিখবো, গল্প উপন্যাসের দিকেও যাওয়ার ইচ্ছে আছে। তবে কবিতা থাকবে।

নির্ঝর : আপনার দ্বিতীয় বই ‘এসো বটগাছ’। আমার মতে বইটা মুক্তগদ্য সংকলন। আপনি বলেন ‘না-কবিতা’। কেনো মুক্তগদ্য বললে কী সমস্যা? আপনার এ জাতীয় রচনাকে তো আমি মুক্তগদ্য মনে করি। আমার সম্পাদিত মুক্তগদ্যের ছোটোকাগজ ‘মুক্তগদ্যে’ও ছাপিয়েছি।

বিধান : বইটার লেখাগুলো যখন বইয়ের কথা ভেবে সাজাই, দেখলাম যে, নানা ধরনের লেখা চলে এসেছে। অধিকাংশ লেখাকেই টানাগদ্যের কবিতা হিসেবে ভাবা যেতে পারে। আবার কয়েকটি লেখাকে গদ্য হিসেবেই লিখেছিলাম। আরেকটি বিষয়, পাণ্ডুলিপি সাজিয়ে লেখাগুলো যখন বার বার পড়ছিলাম, হঠাৎ মনে হলো এখানেই কোথাও কবিতার নতুন কোনো সূচনামুখ লুকানো আছে। যেটা আমার কাব্যভাষা হিসেবে একটা টার্ন নিতে চাইছে। ফলে লেখাগুলোকে আমি মুক্তগদ্য হিসেবে ভাবতে চাইনি। ঠিক কবিতাও না যেন। এগুলো ঠিক ‘কবিতা না’। এই ‘কবিতা না’ কথাটাকেই আমি উল্টিয়ে বলেছি।

নির্ঝর : আমার মনে হয় মিডিওকারগণ মিডিয়ার আশপাশে ঘুরঘুর করে যেমন টিভি চ্যানেলে যাওয়া, খবরের কাগজে কবিতা ছাপানো, খবরের কাগজের সাহিত্য সম্পাদকদের সঙ্গে অতিসম্পর্ক রাখা ইত্যাদি। এইসব না করলে কি লেখার ক্ষতিবৃদ্ধি হয়? মিডিয়া হয়তো বর্তমানে পরিচিতি দেয় একরকম। কিন্তু মহাকাল তো এ হেন মিডিওকারদের মনে রাখে না। এ বিষয়ে আপনার কী মত?

বিধান : আপনি নিজেই তো তাদের সম্মোধন করেছেন মিডিওকার। লেখক তো আর বলছেন না। মিডিওকারের কাজই তো ওই। সে তার কাজ করবে। মিডিয়া মেধাহীনদের কখনও টিকিয়ে রাখতে পারে না বলেই আমার মত। তবে মেধাবীরা মিডিয়ার সামান্য ব্যাকআপ পেলে সকলের সামনে চলে আসতে পারে। কিন্তু, যতটুকু দেখেছি, মেধাবীরা আবার মিডিয়ার লেজুড়বৃত্তি করে না।

নির্ঝর : আপনার প্রিয় কবি কে? এই প্রশ্ন শোনার সঙ্গে সঙ্গে যার নাম মনে এলো সেই নাম করুন।

বিধান : ঠিক প্রিয় কবি হিসেবে কাউকেই নির্বাচন করা নাই। একটি কবিতাও যার ভালো লেগেছে তিনিও প্রিয়। তারও নাম মনে আসে। সেইসূত্রে নাম বলতে গেলে অনেক নামই মনে পড়ছে।

নির্ঝর : আমি জানতে চেয়েছি এই মুহূর্তে কার নাম মনে এলো?

বিধান : অনেকগুলো। আবুল হাসান। ভাস্কর চক্রবর্তী। মজনু শাহ। কামরুজ্জামান কামু। নাহিয়ান ফাহিম, তার একটি মাত্র কবিতা আমার ভালো লেগেছিলো— মাঝে মাঝে খুঁজে নিয়ে পড়ি এখনও। এটা ইনস্ট্যান্ট বলা। হুট করে যে নামগুলো মনে এলো এই মুহূর্তে। গৌতম বসু। বিজয় আহমেদ। রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই, রবীন্দ্রনাথ আসলে আশ্রয়। কবির চেয়েও বেশি কিছু যেন। তাঁর শুধু কবিতা না, গদ্য গল্পও ভালো লাগে।

নির্ঝর : যাদের নাম করলেন করলেন তাদের এক একজন একেক রকম কবিতা লিখেন, তাদের সময়কালও ভিন্ন। কেবল আবুল হাসান আর ভাস্কর চক্রবর্তীকে অনেকদিক থেকেই পাশাপাশি রাখা যায়। তো এদের মধ্যে কারো প্রভাব কি আপনার কবিতায় আছে?

বিধান : সেটা পাঠকের গবেষণার বিষয়। আমি আসলে কবিতা পড়ি। ভালো কবিতা পেলে খুবই আনন্দ হয়। সেটা যে ধরনেরই হোক। উত্তীর্ণ লেখা আর কিছু না, আপনার ভেতরেও অজস্র কথার জন্ম দেবে। লিখতে উস্কানি দেবে। এটুকুই।

নির্ঝর : হ্যাঁ, উস্কানি তো অবশ্যই। কিন্তু সেই উস্কানি থেকে নিজের কবিতা লেখাকে আমি ঠিক বলে মনে  করি না। কেনো মনে করি না তা নিয়ে আমার দীর্ঘ কথা আছে। সে আলাপ আরেকদিন হবে। কিন্তু আপনি কী মনে করেন তা জানতে চাইছি?

বিধান : কেন নয়? প্রেরণা তো নানাভাবেই আসে। তার মধ্যে উত্তীর্ণ লেখা পাঠও একটা। কোনো না কোনোভাবে তো লেখককে চার্জড হতে হবে।

নির্ঝর :  মাঝে মাঝে আপনার কবিতায় দেখি গল্প থাকে, ছয়ের দশকের কবিদের মতো ন্যারেটিভ থাকে। কিন্তু আপনার সমসাময়িক কবিদের মধ্যে সেটা দেখা যায় না। এই বিষয়ে আপনি কী বলবেন।

বিধান : কখনও ভেবে দেখিনি বিষয়টি। তবে সমসাময়িক অন্যদের মধ্যে তা যদি না থাকে তাহলে বলতে হবে অবশ্যই আমার আলাদা একটা পথ তৈরি হয়েছে।

নির্ঝর : আপনার ‘অব্যক্ত সন্ধির দিকে’ বইয়ের কবিতায় দেখা যায় ছন্দশাসনের ব্যাপার আছে। অক্ষরবৃত্তের নিখুঁত প্রয়োগ দেখা যায়। ছন্দের মধ্যে না ফেললে কবিতাগুলির কী ক্ষতিবৃদ্ধি হতো বলে আপনি মনে করেন? আর পাঠক হিশেবে আমি নিজে কখনো কবিতা পড়তে গিয়ে ছন্দ বিচার করিনি, ললিতভাষার রস আস্বাদন করেছি। ধরেন ভাস্বর। তিনি তো প্রথাগত ছন্দরহিত কবিতাই লিখেছেন। তার কবিতা পড়তে গিয়ে আমার কখনোই মনে হয় নাই যে তার কবিতা ছন্দরহিত।

বিধান : সেভাবেও ভেবে দেখি নাই কখনও।

নির্ঝর : অনেককেই দেখা যায় প্রথাগত ছন্দ মানে অক্ষর, মাত্রা আর স্বরবৃত্ত নিয়ে অস্থির হয়ে যেতে। যেনো এই ছাঁচে কবিতাকে না ফেললে কবিতা দাঁড়ায় না। ফলত আমরা দেখি নিখুঁত ছন্দের ছাঁচে ঝুলে আছে শব্দের কঙ্কাল। সেখানে ভাষা নেই। ছন্দ তো একটা কৌশল, সহজেই রপ্ত করা যায়। তাই আমার মনে হয় ছন্দ নিয়ে হইচই না করে ললিতভাষায় লিখতে শেখা অনেক জরুরী। কারণ শেষপর্যন্ত সঠিক ভাষাই সব কিছুর স্রষ্টা। আপনার কী মনে হয়?

বিধান : আমি আসলে কোনো কিছুতেই কট্টর মনোভাবের নই। দক্ষতা থাকা ভালো। ছন্দমূর্খ হতে কে-ই বা চায় বলেন! তবে, কবিতায় ছন্দই শেষ কথা নয়। কবিতার অন্যান্য অনুষঙ্গের মতো ছন্দ একটা অনুষঙ্গ মাত্র।

নির্ঝর : আপনি তো চারুকলার ছাত্র ছিলেন, সেই হিশেবে আপনি একজন চিত্রীও। তো ছবি আঁকা, আপনার লেখার ক্ষেত্রে কতোটা সদর্থক ভূমিকা রাখে?

বিধান : অনেক অনেক। চিত্রকলায় না পড়লে শিল্প বা সাহিত্যের নন্দনকে ওভাবেই হয়তো বুঝেই উঠতে পারতাম না। শিল্পের ইজমগুলো সম্পর্কেও ওখানেই জানা। আর একটা বিষয় শিখেছি ব্যবহারিক জায়গা থেকে। ধৈর্য। স্থির হয়ে গভীর থেকে গভীরে যাওয়ার, আত্মস্থ হয়ে যাওয়া। স্থির হয়ে গভীর থেকে গভীরে যাওয়া, আত্মস্থ হয়ে যাওয়া, বিষয়ের সঙ্গে নিজের আত্মাকে মিশিয়ে দেয়া।

নির্ঝর : আপনার কবিতায় এক ধরনের নস্টালজিয়ার ব্যাপার লক্ষ করা যায়। স্মৃতি কাতরতা, গৃহকাতরতা ইত্যাকার বিষয়। আমার মনে হয় আপনি এইসব থেকে ঠিক বের হতে চান না, এইসবের ভিতরে থাকতেই আপনার ভালো লাগে। আমি কি ভুল বললাম

বিধান : হ্যাঁ, আমার ভালো লাগে। আমার শৈশবটা খুব কালারফুল। তার পরে আমার একটা খুবই স্ট্রাগলিং টাইম গেছে। একেবারে ধ্বংসের ঠিক শেষপ্রান্ত থেকে ফেরা বলা যেতে পারে। ফলে আমার লেখায় এক ধরণের তেজ, অর্থাৎ, তেড়ে ফুড়ে সামনে এগুনোর যে মনোভাব, সেটা যেমন পাওয়ার কথা, তেমনি এক ধরণের স্মৃতিকাতরতা পাওয়ার কথা। এইসবের ভেতর থেকে বের হতে চাই না, এমন না। আমার অবস্থাটাই আসলে ওরকম ছিলো যে বর্তমানের চাইতে অতীতটা মোহময়। আমি সেখানে আশ্রয় নিয়ে চার্জড হতাম। জীবনের মোড় ঘুরে গেলে হয়তো সামনে অন্যধরণের লেখাও আসবে। আমি আসলে জোর করে কিছু লিখতে পারি না। চাইও না। আমার জীবন থেকেই উৎসারিত আমার লেখাপত্র।

নির্ঝর : কেউ কেউ বলেন কবিতা বানানোর জিনিশ। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

বিধান : বানানো বলতে জোর করে কবিতা লেখা? বা, শব্দ বাক্য কবিতার মতো করে সাজিয়ে কবিতা হিসেবে দাবি করা? আমি আসলে শেষ পর্যন্ত যেটা দাঁড়ালো সেটা দেখি। সেটা আমাকে স্পর্শ করলো কিনা তা দেখি। তবে যেটা দেখেছি, এভাবে লিখলে তা বোঝা যায়। শেষ-মেষ তা শব্দের কংক্রিট তৈরি হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে।

নির্ঝর : পশ্চিম বাঙলার কনটেম্পরারি কবিতা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? কলকাতা যেহেতু কসমোপলিটন শহর, সেহেতু কলকাতাকেন্দ্রিক কবিতা আর কলকাতার বাইরে পশ্চিমবাঙলার অন্যান্য বাঙলাভাষী অঞ্চলের কবিতা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ বলেন।

বিধান : সাম্প্রতিক কলকাতার কবিতা, আমি নব্বই পরবর্তী সময়ের কথা বলতে চাইছি, ভার্চুয়াল মাধ্যমেই যতটুকু পড়া হয়ে উঠেছে, তাতে খুব বেশি চমকিত হয়েছি এমন না। অবশ্য ভার্চুয়াল মাধ্যমে যে সব ভালো লেখা আসে এমনও না। হয়তো এমন এমন লেখা হচ্ছে যা আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে আসাম এবং আগরতলা ত্রিপুরার কয়েকজন কবির কবিতা আমি পড়েছি। তারাও পাওয়ারফুল পোয়েট।

নির্ঝর : আমার সর্বশেষ প্রশ্ন—বাঙলা কবিতার ভবিষ্যত কী বলে আপনি মনে করেন?

বিধান : যতদিন বাঙলা ভাষা থাকবে ততদিন বাঙলা কবিতা থাকবে।

নির্ঝর : তো, বিধান অন্য আরেকদিন দীর্ঘ আলাপে-বিস্তারে যাবো। আজকের মতো অধিবেশন শেষ। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ সময় দেয়ার জন্যে।

বিধান : ঠিক আছে। আপনাকেও ধন্যবাদ, নির্ঝর দা।